হাওজা নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেমারাংয়ের গ্রাসিয়া হোটেলের আস্তিনা হলে অনুষ্ঠিত ‘ইসলামের আন্তঃমাযহাবীয় দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি সংলাপভিত্তিক ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আবু হাফসিন বলেন, “মতপার্থক্যের মধ্যেও ঐক্য

গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হলো সংলাপ।”
সেমিনারে সালাতিগার ক্রিস্টেন সাতিয়া ওয়াচানা বিশ্ববিদ্যালয় (UKSW)-এর অধ্যাপক সোমান্তো আল-কুরবাওয়ি, ইন্দোনেশিয়ার কেন্দ্রীয় আহলে বাইত কাউন্সিলের প্রধান অধ্যাপক জাহের ইয়াহইয়া, কেন্দ্রীয় জাভার মুহাম্মদিয়া প্রেস ইসলামিক অ্যাসোসিয়েশনের (PWI) অধ্যাপক রোজিহান এবং JAGI চার্চের পাদ্রি আরিয়ানতা নুগরোহা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন ইন্দোনেশিয়ার আন্তঃধর্মীয় সহাবস্থান ফোরামের মহাসচিব কেএইচ ড. এস. তাসলিম শাহলান।
ধর্মীয় ব্যাখ্যাকে একমাত্র সত্য মনে করার প্রবণতা
আবু হাফসিন তাঁর বক্তব্যে ধর্মীয় ব্যাখ্যাকে একমাত্র সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রবণতার সমালোচনা করে বলেন, কোনো একটি ব্যাখ্যাকে একমাত্র সত্য হিসেবে গ্রহণ এবং অন্য মতকে তাৎক্ষণিকভাবে ভুল বলে প্রত্যাখ্যান করা হলে পারস্পরিক বোঝাপড়ার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যায়।
তিনি বলেন, সব ধর্মীয় বিষয়ই এমন নয় যে সেগুলো পরম ও চূড়ান্ত সত্যের পর্যায়ে পড়ে। কিছু বিষয় মানুষের পাঠ, উপলব্ধি ও ব্যাখ্যার ফল। ফলে এ ধরনের বিষয়ে মতপার্থক্য থাকা একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা এবং তা যথাযথভাবে গ্রহণ করা প্রয়োজন।
এই ধর্মীয় গবেষক আরও বলেন, আরেকটি সমস্যা তৈরি হয় যখন সহাবস্থানকে কেবল আইন বা সরকারি বিধিবিধানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করার বিষয় হিসেবে দেখা হয়। আইন জনপরিসরে মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে; কিন্তু প্রকৃত অর্থে সহাবস্থানমূলক সম্পর্ক কেবল কোনো বিধান মেনে চলার বাধ্যবাধকতা থেকে তৈরি হয় না।
তাঁর মতে, আন্তঃমাযহাবীয় সম্পর্ক গড়ে তুলতে হলে মতপার্থক্যকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। বিভিন্ন গোষ্ঠীর পারস্পরিক সম্পর্ককে সবসময় রাজনীতি ও স্বার্থের কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়।
তিনি বলেন, “আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি যদি এখনো রাজনীতি ও স্বার্থকেন্দ্রিক থাকে, তাহলে সংলাপ হওয়া কঠিন।”
শিয়াদের অন্তর্ভুক্তির পক্ষে ইন্দোনেশীয় আলেমের অবস্থান
ইন্দোনেশিয়ার ধর্মীয় চিন্তা ও বিভিন্ন ধর্মীয় ধারায় শিয়া মতের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে আবু হাফসিন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মূলধারার বাইরে রাখা একটি গোষ্ঠীর প্রতি উন্মুক্ততা আরও বিস্তৃত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রচেষ্টার অংশ হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, “আমি যদি কেন্দ্রীয় জাভার উলামা পরিষদের সভাপতি হতাম, তাহলে শিয়াদের কেন্দ্রীয় জাভার উলামা পরিষদের সদস্য হিসেবে গ্রহণ করার প্রতিশ্রুতি দিতাম।”
আবু হাফসিনের বক্তব্যে আন্তঃমাযহাবীয় সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এসেছে। তাঁর মতে, ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য মতপার্থক্য দূর করে দেওয়া কিংবা কোনো একটি ব্যাখ্যা সবার ওপর চাপিয়ে দেওয়া প্রয়োজন নেই। বরং প্রয়োজন মতপার্থক্যকে স্বীকৃতি দেওয়া, পারস্পরিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করা এবং এমন সংলাপের পরিবেশ গড়ে তোলা, যার মাধ্যমে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে বুঝতে পারে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে সংলাপ কেবল ঐক্যের একটি সহায়ক উপাদান নয়; বরং এটি এমন একটি কার্যকর পথ, যার মাধ্যমে মতপার্থক্য বিলোপের দাবি ছাড়াই ঐক্য ও পারস্পরিক বোঝাপড়া বিকশিত হতে পারে।

উল্লেখ্য, সেমিনারে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক পটভূমির ইসলামি ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ ও ধর্মীয় নেতারা অংশ নেন। তাঁরা আন্তঃমাযহাবীয় সম্পর্ক এবং মতপার্থক্যের মধ্যেও ঐক্য, সহাবস্থান ও পারস্পরিক বোঝাপড়া গড়ে তোলার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন।
আপনার কমেন্ট